9/25/15

একটি পঁচিশে সেপ্টেম্বর

কমলাপুর রেলস্টেশন। রাত আটটা বা নয়টা। সময় দেখার সময় ছিল না। মন ছিল পুরোপুরি বিক্ষিপ্ত। সাড়ে চার বছরের ফুলবাগান এক ঝড়ে ভেঙ্গে গেলে যতটা বিষ্ময় কাজ করার কথা তার চেয়েও বেশি বিষ্মিত ছিল ছেলেটা। সময়ের দিকে খেয়াল করার অবকাশ পায় নি সে।

প্রেমে পড়লে মানুষ পাগল হয়। প্রেম চলাকালীন মানুষ পাগল হয়। সবাই বলে। ছেলেটা বিশ্বাস করত। কারণ নিজেকে সে পাগল হিসেবেই দেখেছে। মেয়েটার প্রেমে পড়ার পর পাগল ছিল সে। প্রেম চলাকালীন পাগল ছিল সে। লোকে আরো বলত প্রেম ভেঙ্গে গেলে মানুষ পাগল হয়। ভয়ানক পাগল। ছেলেটা ঠিক বিশ্বাস করতে চাইত না। বলত ও কখনো ছেড়ে যাবে না। ঠিকই একটা না একটা কারণ খুঁজে নিয়ে পাশে থেকে যাবে। ঠিক যেমন থেকেছে সাড়ে চার বছর। সবাই না হাসলেও কেউ কেউ হাসত। হাসত মেয়েটাও, পরে জানা গেছে যদিও। ছেলেটার এহেন পাগলামী দেখে মেয়েটাও হাসত খুব। আর বলত কখনো ছেড়ে যাবে না। বিশ্বাস পাকাপোক্ত হতে থাকে। আরো একটু শান্তি লাগতে থাকে হৃদয়ে। শরতের আকাশে মেঘের সাথে ওড়ে কিছু সুখ। ছেলে মেয়ে দুটো যেন শরতের কাশফুল হয়ে যায় ক্রমশ।

একদিন হঠাৎ আসে মেসেজটা। সব কিছু শেষ। গত এক বছর ধরে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে মেয়েটা। ছেলেটাকে গুছিয়ে নিতে বলে। ভাল থাকতে বলে। ছেলেটার বিষ্ষয় কাটে না। কাটতে চায় না। আগেও এমন মেসেজ এসেছে সব শেষ বলে। এমন কখনো লাগে নি। আজ যেন কিছু একটা বিষাদ লেগে আছে মেসেজে। পাগল হয়ে যায় ছেলেটা। ফোনের পর ফোন,,,,,,,,

কোন সাড়া নেই।
সাড়া আর থাকবে না এটা বুঝতে পারলে ছেলেটারই উপকার হত। নিজেকে শান্ত করতে পারত। সব কিছু কি আর মেসেজের লেখার মত সহজ হয়? হয় না। ছেলেটা দিশাহারা হয়ে ছুটতে থাকে। কোথায় যাবে জানে না। চলতে চলতে গিয়ে উঠল এক প্লাটফর্মে। না, নামল এক প্লাটফর্ম থেকে। নিচে, রেললাইনের ওপর। ট্রেন আসবে। প্রতারিত হবার চেয়ে মরা ভাল এই ফালতু যুক্তিই তখন তার কাছে ষোনার খনি।

কার জীবনে কখন কী ঘটে কে বলতে পারে। ট্রেনটা চলে যায়। গাইবান্ধার কোন এক পাগল তাকে বাঁচিয়ে দেয় আজকের এই লেখা লেখার জন্যে।

মেয়েটা সুখে আছে। ভাল আছে। থাকার কথা। ছেলেটা ভাল আছে। সুখে নেই। দুঃখেও নেই। শরতের আকাশে আছে। কাশফুলে আছে। শহিদ মিনারের ওয়ালে আছে। :-)

9/23/15

আমারও যে একলা লাগে

টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চাল, শব্দ তাই অসাধারণ শ্রুতিমধুর।

এই সব দিনে ভাল লাগা গুলোও খারাপ লাগা হয়ে যায়। মনে পড়তে থাকে একগাদা ভিজে স্মৃতি। যন্ত্রণা বাজতে থাকে কানে। রোমান্টিসিজম ভাজতে গিয়ে মন বেচারা হাওয়ায় ওড়ে; আনন্দের নয়, আবেগে কেঁদে ফেলা ঝড়ো হাওয়ায়। তুফান বৃষ্টিতে পাখি যেমন চুপচাপ বসে থাকে, মন খারাপের ব্যক্তিগত অধিকারীটিও চার চালা টিনের চালের নিচে ধুম মেরে পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে বই উল্টায়, পছন্দের-অপছন্দের, প্রিয় মানুষের পছন্দের, কোথাও হঠাৎ শোনা ভাল বইটি। পড়া না হলেও এই সব দিনে বই জড়িয়ে কেঁদেকেটে পড়ে থাকা যায়। আসলে থাকতে হয়। উপায় কী!

পৃথিবীতে ভাল থাকার ওষুধ গুলো ক্রমে জীবন বাঁচানোর ওষুধে পরিণত হয়। সময়ের সাথে, ভালবাসার সাথে, ভালবাসা পাবার সাথে। বোঝা যায় ভালবাসা হারানোর সাথে, ভালবাসা বেড়ে যাবার সাথে। পরিমাপ করা না গেলেও ভালবাসা বেড়ে যাওয়া বোঝা যায় ক্রমশ কষ্টে নীল হয়ে যাবার সাথে। মিথ্যের দুনিয়ায় সত্যকে সত্য বলার মত সাহস হারানোর সাথে।

পণ করে ভাঙ্গা আমাদের আদিম অভ্যাস। নিয়মের বাইরে যাওয়া পৌরাণিক থেকে চলে আসছে। আদম ইভের পরে হাজার রাত-দিন-মাস-বছর মানুষ নিয়মের বাইরে গেছে, যাচ্ছে। কিছু নিয়ম আবার নিয়মের মাধ্যমে তৈরি হয় নি, তারা কেবল অনিয়ম অথচ নিয়ম!

বৃষ্টি থামছে না। বছর খানেক আগে এই সব দিনে মন খারাপ হত, ভয়ানক মন খারাপ। একা লাগত খুব। থাকতাম একা। বই পেলেই পড়ে ফেলতাম। আবার সেসবের পূনরাবৃত্তি হচ্ছে। আটকাতে পারছি না। অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াটা নাকি উত্তম কাজ। মাঝে মাঝে আফসোস লাগে আমি কখনো উত্তম হতে পারলাম না কেন! তাহলে অন্তত বৃষ্টির পথে মন খারাপ উড়িয়ে নিজেও সুখে থাকতাম। এমন ঝরঝর দিনে ক'দিন মন খারাপ করে থাকা ঠিক?

একজন অপরিচিতের কথা মনে পড়ছে। একটা বাস জার্নি। তার প্রেম কাহিনী বলে আমাকে অপরিচিতের গন্ডিতে পরিচিত বানিয়ে রেখে দিয়েছে। ফোন নাম্বার দিয়ে বলেছিল কথা বলতে, উইশ করতে। হারিয়ে ফেলেছি। তার জন্যে খারাপ লাগে। কথা রাখতে পারিনি।

একটা রেল লাইনের কথা মনে পড়ে, সেখানে কোন পাখি নেই। কাক ছাড়া। সবাই বলত। অথচ আমি জানি কাক একটা পাখিই। সবাই কাককে কাক বলে কেন? পাখি বললে কি অন্য পাখিদের জাত চলে যায়? কই তারা তো কখনো অভিযোগ করে নি! মানুষ কেন তাদের আলাদা করতে চায়? পাখিরা কথা বলতে পারে না বলে মানুষের অনেক সুবিধা। নিশ্চয়ই কাকেরা নালিশ করত আমার কাছে, ফুলের কাছে, গাছের কাছে, ইট-কাঠ-পাথরের কাছে।

রেল লাইনটা উঁচু, আর লম্বা। দুটো পাত চলে গেছে দিগন্তে। কাছে থেকেও কত দূরে তারা; তারা থেকে তারাদের দুরত্বও বুঝি অত না। সারা জীবন পাশে থাকা কাউকে ছুয়ে দেকতে না পারার দুঃখ কতটা? কথা বলতে পারলে রেল লাইন বলে দিত। আমি মাঝে মাঝে বুঝি। বৃষ্টির সময় বেশি বুঝি। ঠিক এখন। হয়তো দিগন্তে ছুয়ে দেখা যায়। কিন্তু সে দেখা কেবলই ঝাপসা।

ফিরে ফিরে আসা আমাদের ধর্ম। কারণ আমরা না মানি নিয়ম, না মানি পণ করা কথা।
বৃষ্টিও ফিরে ফিরে আসে। ফিরে আসে না যার আসার কথা। ফিরে আসে না যে কথা দেয়। ফিরে আসে না যে ভালবাসে। ফিরে আসে না যে স্বপ্ন দেখায়। ফিরে আসে তখন যখন আবার চলে যাবার সময় হয়; উল্টেপাল্টে দিতে হয় জীবন তখন। এবং আবারও ফিরে যায় সে। তারপর আবার একরাশ স্মৃতি, বৃষ্টি, কাক, বই, রেল লাইন,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

9/16/15

কিছু প্রশান্তির খোঁজে

দেখা যাক কোথায় গিয়ে থামি
কোথায় গিয়ে নামি।
উঁচুতে উঠলামই বা কবে,
নামার ভয়ই বা আসবে কেন?
তবুও রয়ে যায় কিছু দ্বিধা,,,,,,

9/13/15

ভ্যাট অন এডুকেশন ও কিছু কথা

ফ্রয়েডীয় দর্শনমতে মানুষের মৌলিক চাহিদা দুটি। খাদ্যের চাহিদা, যৌন চাহিদা।

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মৌলিক চাহিদার বাস্তবিক বিস্তার বেড়ে যায়। পরিবর্তিত হয়। যে সভ্যতা যত এগিয়েছে তার সভ্যদের চাহিদা তত বেড়েছে। সেই সাথে কিছু চাহিদা হয়ে গিয়েছে আবশ্যিক। বস্তুত আবশ্যিক হবার পেছনে কারণ কিন্তু সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। প্রাচীন সভ্যতায় খাবার পেলে মানুষ ভাবত তার চাহিদা পূরণ হয়েছে। ভাবনাটা তখন এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। আস্তে আস্তে এর সাথে যোগ হতে থাকল বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা। তবে যৌন চাহিদাকে আর কোন সভ্যতাই মৌলিক চাহিদা রূপে প্রচার করতে চাইল না। তা হয়ে গেল ট্যাবু।

বাংলাদেশের যে অবস্থান তাতে এই উন্নয়নশীল দেশের প্রধাণ মৌলিক চাহিদা গুলোর প্রথমেই থাকে শিক্ষা। শিক্ষাই পারে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের কাতার থেকে বের করে আনতে অপরিণত মস্তিষ্কজীবী কিছু মানুষ শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপ করতে যাচ্ছে। ভ্যাটের ডেফিনেশন এমন যে বিনিময় যোগ্য কোন কিছুর জন্যে অর্থের লেনদেনে সরকারকে অতিরিক্ত কিছু অর্থ প্রদান করতে হবে। প্রতিটা ট্রানজেকশন হবে সরকারের আয়ের উৎস। এখন প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষার্থীরা কি শিক্ষা ক্রয় করছে? উত্তর না হলে কেন তারা ভ্যাট দেবে?

আমার খারাপ লাগে তখনই যখন ভাবি পুরো পৃথিবী তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে আর আমরা পেছনে পড়ছি না শুধু, পিছলে যাচ্ছি অবনতির দিকে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে লজ্জ্বা পাই যখন দেখি আমাদেরই প্রতিবেশি রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় শিক্ষা, চিকিৎসা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। আর আমরা শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর পায়তারা করি!

#শিক্ষায়_ভ্যাট_বন্ধ_কর
মৌলিক অধিকার নিশ্চিত কর

9/9/15

একজন গনিতবিদ

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন চমৎকার ছাত্র। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের রেকর্ড মার্কস তাঁর ছিল যতদিন পর্যন্ত এ এফ মুজিবুর রহমান নামে মেধাবী ও ক্ষণজন্মা মানুষটি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন নি।

মাত্র ৪৮ বছরের সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ এক জীবনের নাম এ এফ মুজিবুর রহমান(২৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৭- ১২ মে ১৯৪৫)। জন্ম ফরিদপুর জেলায়। পড়াশুনা ফরিদপুর জিলা স্কুল, ঢাকা কলেজ। মাস্টার্স করেন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত রেকর্ড ভেঙ্গে দেন। তিনি পড়েছেন balliol college ofoxford university তে।

রহমান সাহেব ছিলেন ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট জজ(১৯২৯-৩১)। ন্যায়ের মত ও পথ ছিল তাঁর এগিয়ে চলার সাথী।

এ এফ মুজিবুর রহমানের সম্মানার্থে তাঁর ছেলে রেজাউর রহমান গড়ে তোলেন দাতব্য সংস্থা AF MUJIBUR RAHMAN FOUNDATION। ১৯৮৫  সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি এখন পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে সাহায্য করে যাচ্ছে। ব্যবস্থা করেছে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, পুরস্কার ইত্যাদি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগগুলোতে চালু আছে শিক্ষাবৃত্তি।  এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের IBA, INSTITUTE OF CHARTERED ACCOUNTANTS OF BANGLADESH, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া হয় বিশেষ বৃত্তি।

বাংলাদেশ ম্যাথম্যাটিকাল সোসাইটি আয়োজিত national mathematics undergraduate olympiad এর সার্বিক আর্থিক সহায়তা আসে এ এফ ফাউন্ডেশন থেকে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত গনিত ভবনটিও এই ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে নির্মিত।

কিছু অসংলগ্নতা

আঁধারের মত স্বচ্ছ আর কি কিছু আছে?
গাঙের ধারে বেড়িবাঁধ উপচে পড়া আঁধারের চাইতে স্বচ্ছ কিছু?
দিনের আলোয় লুকিয়ে থাকা তারার মেলা দেখি,
রাতের আকাশে। স্বচ্ছ আঁধারে।
ভাবনা চলে যাচ্ছে আলোর বেগে দূরে,
কেন এমন হয়? পাখির ডানার মত বাতাস কেটে এগিয়ে যায় তারা,
ভাবনারা।

হাজার বছরের পাখির ডাক ভেসে আসছে কানে,
চোখে ধরা দিচ্ছে অব্যক্ত দ্বিধা;
পাগল হয়ে যাচ্ছি না তো!

শরতের আকাশ মেঘমুক্ত কেন?
রাশি রাশি তুলোর পাহাড় পালিয়েছে কোথায়?
নাকি বুঝিয়ে দিচ্ছে পাল্টে যাচ্ছি দ্রুত,
সব ভাবনা-অভাবনা সাথে নিয়ে
স্বচ্ছ আঁধারের সমান্তরাল পথে
যার কিনারা কেউ কখনো পাবে না,,,,,,,,,,

কোন একদিন

সময়টা বড্ড খারাপ যাচ্ছে শিমুলের। একে তো মস্তিস্কের স্মৃতিরক্ষার লোবের এক চতুর্থাংশ অক্ষম হয়ে গেছে গত পরশু সন্ধ্যায়, আজ ঠিক এই সময়টাতেই তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল খুলে পড়ে গেল!

হাতটা স্টেইনলেস স্টিলের সাথে কার্বন ফাইবারের সূক্ষ সংকরে তৈরি পদার্থ দিয়ে বানিয়ে দিয়েছিলাম গত মাসে। কাহিনীটা অবাস্তব ঠেকলেও সত্যি।

আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে নিয়ম মাফিক হাঁটতে বেরিয়েছিলাম ছোট্ট শহর সলসমারসির ইলেক্ট্রনিক্স সিঙ্গেল ট্রাক রাস্তা তে। রাস্তাটা বানানো হয়েছিল মূলত পথচারীদের শ্রম কমিয়ে সময় সাশ্রয় করাতে। শাটল ট্রেন বা বাসের মতই এটি কাজ করত। পাঁচশ মিটার পরপর জেনোপ্লেস আছে রাস্তাটার যেখান থেকে রাস্তায় ওঠা যায় এবং রাস্তা চলতে থাকে। গতিবেগ মানুষের হাঁটার স্বাভাবিক গতির দ্বিগুন।
কিন্তু ক্রমে বিদ্যুতের ঘাটতিতে অফ করে দেওয়া হয় রাস্তাটা।
এখন এই রাস্তায় সবাই মর্নিং ওয়াক করে।

তো শিমুলের কথায় ফেরা যাক। পাঁচ বছর আগের সেই দিনটা আমার স্পষ্ট মনে আছে 2051 সালের ১০ জানুয়ারি। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর চরম প্রভাবে শীত তখন নেই বললেই চলে। হাঁটছি আর আমার হাতে থাকা একটা প্রোজেক্ট নিয়ে ভাবছি, কি করে মানব মস্তিস্কের স্মৃতিধারন কে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায় অসীম পর্যন্ত।

হঠাত্‍ একটা মোড় নিতেই দেখি সোলার ডাস্টবিনের পাশে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর নিথর দেহ।
দৃত তুলে নিলাম কোলে, হ্যাঁ বেঁচে আছে। বিষ্মিত হলাম চল্লিশ বছর আগের মত আজও এমন কান্ড ঘটে!
যা হোক প্রথমে কল করতেই একটা ডেস্কো এলো যা এম্বুলেন্সের মতোই তবে চালক বিহীন। রোগীকে উঠিয়েই নির্দেশকে চাপ দিলাম হোম অফ প্রফেসর শঙ্কু।
ব্যস কয়েক মিনিটেই পৌছে গেলাম বাড়িতে।

এরপর চিকিত্‍সার দায়িত্ব দিলাম রোবট মায়ানথাল এর কাছে। ও চার দিনেই মোটামুটি সুস্থ করে দিল বাচ্চাটাকে। বাচ্চাটার মাথায় সামান্য কয়েকটা লাল চুল ছিল তাই শিমুল নাম রাখা হল। এরপর প্রথা অনুযায়ী সাধারন নাগরিকদের মতো ওকেও সেমি রোবটে পরিনত করার সময় এসে গেল। আমি ওর যাবতীয় প্রোগ্রাম করে দিলাম একটা মাইক্রো চিপে এবং তা ছোট্ট অপারেশন করে ওর দেহে ঢুকিয়ে দেওয়া গেল। এরপর আমার প্রোজেক্টের পরীক্ষা ওর ওপরেই খাটালাম।
প্রোগ্রাম করার সময় একটা বিশেষ পরিসংখ্যান তত্ব ওর চিপে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম যাতে ও অতি দ্রুত হিসাব করতে পারে এবং তা সংরক্ষন করতে পারে।
শহরের পাঁচ হাজার জনসংখ্যার ফুল ডাটা আমি ওর ব্রেইনে প্রবেশ করিয়ে দিলাম।

এভাবে চলল ওর ওপরে গবেষণা প্রায় পাঁচ বছর এবং গত পরশু ও নিজে নিজে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ডাটা বিন্যস্ত করতে গিয়ে স্মৃতি মস্তিস্কের এক চতুর্থাংশ অকেজো করে ফেলে আর আজ তা বুঝতে পেরে বেচারা রেগে মেঝেতে কার্বনেডোর পাতে ঘুষি মারতেই আঙ্গুলটা ভেঙ্গে ফেলে।

আমি চিন্তা করছি এবার আরো স্থিতিস্থাপক কিছু দিয়ে ওর আঙুল বানিয়ে দেব।

শবযাত্রী

অটো থামান!

অটোওয়ালা ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে গেল যেন। বাম পাশে কর্পোরেশনের বেড়া। ডানপাশে পুকুর। এমন জায়গায় কেউ নামতে চায় না কখনো। তাছাড়া এমন কড়া সুরে তো কখনোই না। সুরটা কড়া কি ঠিক? নাকি আরো একটু অন্য রকম। তীব্র বিবমিষা আর বিরক্তিভরা সুর। অটো থেমে গেল।

মুখের দিকে না তাকিয়েই পাঁচ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিল প্রমিথিউস। আর শান্ত গলায় তীব্রভাবে বলল মানুষকে অমানুষ ভাবা সত্যিকারের অমানুষদের সাহচর্য আমার সবচেয়ে অপছন্দের।

অটোওয়ালা আবারও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বুঝে উঠতে পারল না কিছু। বোঝেই বা ক'জন! প্রমিথিউসের কথা নাকি তার বাড়ির লোকজন বোঝে না, বন্ধুরা বোঝে না, ক্লাসের লেকচারার বোঝে না। এমনকি ল্যাবের মামারাও বোঝে না। প্রমিথিউসেরও মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় নিজের প্রকাশভঙ্গীর অব্যক্ততা নিয়ে। তবে সে কজনে লাগায় সামান্যই। চলছে এভাবেই।

মনে মনে প্রমিত ক্ষেপে আছে ভয়ানক। চোখের শিরা টানটান হয়ে আছে। অটো চলে যাবার পারপরই সে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করে। খানিকটা গিয়েই কর্পোরেশনের বেড়ার ফাকা দিয়ে বেড়িবাঁধের ওপরে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে। সেটা বেয়ে উঠে যায় সে। বাতাস এসে লাগে তার গায়; পদ্মার বাতাস। হাজার বছর আগে বেহুলা, চাঁদ সওদাগর এমনই বতাস পেত হয়তো। মনটা একটু শান্ত হয়। ধীরে ধীরে প্রমিত নেমে যায় পদ্মার চরে।

সন্ধ্যা নেমেছে মাত্র। ভাদ্র মাসে মাঝামাঝি সময়ে আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘ। তারই কয়েকটা ছায়া মাথার ওপর দিয়ে দিগন্তের দিকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে। মনটা শান্ত হয়ে যাচ্ছে। হওয়া দরকারও বটে। আজও বই কেনা হল না। অথচ আজ তো মন ঠিক করেই বেরিয়েছিল সে; বই কিনবেই। ছয় মাস হঢে গেছে বই না কিনে আর কতদিন থাকা যায়। সামনে আবার ক্লাসটেস্টের ঝামেলা আছে। ঝামেলাই তো! পড়ালেখার চেয়ে ঝামেলার কিছু আছে পৃথিবীতে?